আরামকোর সদর দপ্তরে হুতিদের হামলা, তেলের বাজারে অস্থিরতা
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
১৫-১০-২০২৬ ১১:০৯:১২ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় :
১৫-১০-২০২৬ ১১:৪৩:৫৯ পূর্বাহ্ন
ছবি: সংগৃহীত
ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। দেশটির বিমানবন্দরগুলোতে ধারাবাহিক হামলার পর এবার রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর প্রধান কার্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে গোষ্ঠীটি। এতে পূর্বাঞ্চলীয় শহর ধাহরানে অবস্থিত সদর দপ্তরের একটি প্রশাসনিক ভবনে আগুন ধরে যায় এবং কয়েকটি তলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে এ ঘটনায় কেউ হতাহত হননি।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাতে চালানো এ হামলার দায় স্বীকার করে ইরান-সমর্থিত হুতিরা জানিয়েছে, সৌদি আরবের আরও কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। বুধবার (১৪ অক্টোবর) তারা নতুন করে হামলার হুমকি দিয়ে সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাগুলোকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ বলে ঘোষণা করে।
এর আগে ইয়েমেনের রাজধানী সানার উপকণ্ঠে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হামলা চালায়। দেশটির পেট্রোলিয়াম কোম্পানির একটি জ্বালানি ডিপোসহ কয়েকটি স্থাপনা ছিল ওই হামলার লক্ষ্য। সানায় হামলার কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি আগেই দিয়েছিল হুতিরা। সে সময় সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ধাহরানের আরামকো সদর দপ্তর ও রিয়াদের একটি তেল শোধনাগারের নামও উল্লেখ করেছিল তারা।
ধাহরানের আরামকো কমপ্লেক্স থেকে স্থল ও সমুদ্রের তেলক্ষেত্র, পাইপলাইন, শোধনাগার এবং রপ্তানি টার্মিনালের বিশাল নেটওয়ার্ক পরিচালনা ও তদারক করা হয়। হামলার পরও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। তবে কিছু কর্মীকে বাসা থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার পর ভবনটিতে সীমিত পরিসরে আগুন লাগে। তবে ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত কয়েকজন ব্যক্তি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, আগুন ভবনটির কয়েকটি তলায় ছড়িয়ে পড়ে এবং ওপরের তিনটি তলা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তেলের দাম বাড়ছে, হরমুজে উদ্বেগ
আরামকোর সদর দপ্তরে হামলার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রভাব ফেলেছে। বুধবার অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯১ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ১০৬ দশমিক ৬০ ডলারে পৌঁছায়।
এদিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সোমবার ও মঙ্গলবার সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত দুটি কনটেইনার জাহাজ অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর একটি জাহাজে আগুন ধরে যাওয়ার পর সেটি ডুবে যায়। দুই জাহাজের ৪৩ জন নাবিককে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউবিএসের বিশ্লেষক জিওভানি স্তাউনোভোর মতে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা এবং সৌদি-হুতি সংঘাত তেলের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বারবার হামলার মুখে সৌদির বিমানবন্দর
হুতিদের দাবি, ধাহরানের আরামকো স্থাপনার পাশাপাশি রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও রাজধানীর একটি আরামকো শোধনাগারেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
গত এক সপ্তাহে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চারবার হামলার শিকার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত শনিবারের হামলায় ১৩ জন নিহত ও ৩০০ জনের বেশি আহত হন। পরদিন আরেকটি হামলায় একজন নিহত এবং ১১ জন আহত হন। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে সৌদি কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরটি আগামী শনিবার পর্যন্ত বন্ধ রেখেছে। এতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের ফ্লাইটও বাতিল বা স্থগিত হয়েছে।
বুধবার রিয়াদের দিকে ছোড়া আরেকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। এর আগের দিন দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার পর সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ পড়ে চারজন আহত হন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৫টি বাড়ি।
ইয়েমেনে পাল্টাপাল্টি অভিযান, বাড়ছে মানবিক সংকট
গত মাসে লোহিত সাগরের উপকূল ধরে অগ্রসর হয়ে কৌশলগত বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছে পৌঁছায় হুতিরা। এরপর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিয়ে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট।
জোট ও সরকারপন্থী বাহিনীর পাল্টা অভিযানে বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছের কিছু এলাকা থেকে পিছু হটেছে হুতিরা। তবে আশপাশের এলাকায় তাদের অবস্থান রয়েছে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের আরেকটি কেন্দ্র তাইজের আশপাশেও অগ্রসর হচ্ছে গোষ্ঠীটি।
যুদ্ধের প্রভাবে ইয়েমেনের মানবিক পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটছে। আন্তর্জাতিক রেডক্রস জানিয়েছে, যুদ্ধাহত মানুষের চাপ সামলাতে দেশটির হাসপাতালগুলো হিমশিম খাচ্ছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) বলেছে, হুতিদের অবরোধের কারণে তাইজে ছয় লাখের বেশি মানুষের কাছে জীবন রক্ষাকারী সহায়তা পৌঁছানো যাচ্ছে না। তাঁদের মধ্যে দুই লাখের বেশি নারী ও শিশু।
নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বিশ্লেষক নওয়াফ ওবায়েদ আল-জাজিরাকে বলেছেন, আকাশপথে হামলা বাড়লেও সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বড় ধরনের স্থল অভিযান এখনো শুরু হয়নি। তাঁর ধারণা, প্রথমে হুতিদের জ্বালানি ও সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার চেষ্টা করা হতে পারে। এরপর তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার বিস্তার ঠেকানো এবং দখলে যাওয়া অঞ্চল পুনরুদ্ধারে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হতে পারে।
সৌদির অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় নতুন চাপ
হুতিদের ধারাবাহিক হামলা সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অর্থনীতি বহুমুখীকরণের পরিকল্পনাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, পর্যটন, বিনোদন ও ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে সৌদি আরবকে প্রতিষ্ঠা করতে চায় রিয়াদ। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে তুলে ধরে দেশটি।
কিন্তু রাজধানীর প্রধান বিমানবন্দর থেকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল কোম্পানি আরামকোর সদর দপ্তর—গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো একের পর এক হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। একই সঙ্গে রিয়াদে অনুষ্ঠেয় বড় বিনিয়োগ সম্মেলন ও আন্তর্জাতিক আয়োজন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে নিরাপদ ব্যবসায়িক গন্তব্য হিসেবে সৌদি আরবের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এদিকে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে সৌদি আরবকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছিল ইসরায়েল। ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজ-এর বরাতে তুরস্কের সংবাদ সংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ওই প্রস্তাবে আগ্রহ দেখাননি। ইসরায়েলের সঙ্গে প্রকাশ্য সামরিক সহযোগিতা সৌদি জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে রিয়াদ এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স